যশোরের বিশাল জনসভায়, প্রধানমন্ত্রী নৌকায় ভোট দিয়ে সেবা করার সুযোগ দিন;

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য যশোরবাসীর কাছে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টানা দুই মেয়াদের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে আবারও ভোট দিয়ে দেশসেবার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা যেভাবে অতীতে নৌকায় ভোট দিয়েছেন; সেভাবে নৌকায় ভোট দিয়ে, নৌকার প্রার্থীকে জয়যুক্ত করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিবেন আমি সেটাই চাই। এসময় যশোরবাসীর কাছে ভোটের অঙ্গিকার চেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা কী নৌকায় ভোট দিবেন? হাত তুলে দেখান। জবাবে যশোরের মানুষ হাত উচিয়ে শেখ হাসিনার প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানান ও ভোট দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন।

রোববার যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে যশোর জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়, মানুষের কল্যাণে কাজ করে। মানুষের জীবনে শান্তি দেখা দেয়। তাই অতীতে যেভাবে ভোট দিয়েছেন, সেভাবে আবারও নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে মানুষের সেবা করার সুযোগ দেবেন।

বিএনপি জামায়াতের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার দেশের উন্নয়ন করে। সেখানে বিএনপি-জামায়াত জোট কী করে? তারা কেবল মানুষ হত্যা করে, খুন করতে পারে। দুর্নীতি-দখল-লুটপাট করতে পারে। আর আওয়ামী লীগ দেশে শান্তি দেখতে চায়। বিএনপি-জামায়াত জোটের কাজই হচ্ছে খুনখারাবি আর দখল-লুটপাট। হত্যা-খুন-দুর্নীতি, মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করা- এটাই তাদের কাজ। তারা ধ্বংস করে, মানুষের কোনো কল্যাণ করতে পারে না।

৫ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর যশোর জেলায় আগমন ও জনসভাকে ঘিরে গোটা জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ২০১৪ সালে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার এটিই যশোরে প্রথম জনসভা। এর আগে ২০১২ সালে এই জেলায় সর্বশেষ জনসভায় অংশ নেন তিনি। দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কাছে পেয়ে যশোরের মানুষের মধ্যে বিপুল উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা দেখা গেছে। জনসভাকে কেন্দ্র করে দলের নেতাকর্মীদের উৎসাহ উদ্দীপনা ও প্রাণ চাঞ্চল্যও তৈরি হয়। যশোর শহর ও সংলগ্ন এলাকাগুলোকে বর্ণাঢ্য সাজে সাজিয়ে তোলা হয়।

গোটা জেলা শহরসহ সবগুলো সড়কে ফুল, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি, নৌকার প্রতিকৃতি এবং দুই শতাধিক ছোটবড় সুসজ্জিত তোরণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানো হয়। শহরের প্রবেশমুখে কয়েক কিলোমিটার আগে থেকে প্রতিটি রাস্তায় কয়েক গজ দূরে দূরেই স্বাধীনতা তোরণ, শেখ রাসেল তোরণ ও শেখ ফজলুল হক মনি তোরণসহ যশোরের প্রয়াত কয়েকজন নেতার নামে এ তোরণগুলোর নামকরণ করা হয়। এছাড়া প্রধান সড়কের দুইপাশে শোভা পেয়েছে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের তথ্যচিত্র সম্বলিত বিভিন্ন আকারের বিলবোর্ড, ব্যানার-ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড। জনসভাস্থল ঘিরে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

দুপুরের এই জনসভায় যোগ দিতে সকাল থেকেই নেতাকর্মীরা জনসভাস্থলে আসতে শুরু করেন। যশোর ছাড়াও খুলনা, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও নড়াইলসহ আশপাশের জেলাগুলো থেকে বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন ও পায়ে হেঁটে জনসভায় যোগ দেন তারা। তাদের সঙ্গে ছিলেন সর্বস্তরের সাধারণ মানুষও। অনেকে নৌকা প্রতীকসহ বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচেগেয়ে জনসভাস্থলকে আনন্দমুখর করে তোলেন। দুপুর নাগাদ মানুষের ভিড় জনসভাস্থল ছাড়িয়ে আশপাশের কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে জনসভাস্থলের আশপাশের উঁচু ভবনে ভিড় জমান। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার সুযোগ করে দিতে শহরের বিভিন্নস্থানে দুই শতাধিক মাইক বসানো হয়। বিভিন্ন পয়েন্টে বিশাল ডিজিটাল প্রজেক্টরের সাহায্যে জনসভার কার্যক্রম প্রচার করা হয়। এসব মাইক ও প্রজেক্টরের সামনেও ছিল উৎসুক মানুষের ভিড়।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারযোগে সকাল ১১টায় জেলা শহরের বিমানবাহিনীর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাটিতে অবতরণ করেন। এরপর বিমান বাহিনী একাডেমিতে রাষ্ট্রপতির কুচকাওয়াজ-২০১৭ (শীতকালীন) অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরে স্থানীয় সার্কিট হাউজে মধ্যাহ্ন ভোজ ও বিশ্রাম শেষে বিকেল সোয়া ৩টায় জনসভাস্থলে এসে পৌঁছান তিনি। এ সময় জনতা বাধভাঙা উচ্ছ্বাস ও তুমুল স্লোগানের মাধ্যমে স্বাগত জানান তাকে। জাতীয় পতাকাসহ রংবেরঙের পতাকা নেড়ে শুভেচ্ছা জানানো হয় তাকে। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। জনসভা শুরুর আগে যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দান থেকে ২৮টি উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।

আওয়ামী লীগের ভিশন তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগেই এদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। দেশে কোনো দরিদ্র থাকবে না। দেশের উন্নয়ন হবে। কারণ আওয়ামী লীগ জাতির পিতার নেতৃত্বে দেশকে স্বাধীন করেছে। আমরা বিজয়ী জাতি। বিজয়ী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে চলতে চাই। বিজয়ী দেশ হিসেবেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ সবসময়ই এটাই চায়, দেশটা এগিয়ে যাক। দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এদেশের মানুষ কারও কাছে ভিক্ষা না করে মাথা উঁচু করে চলবে। তার সরকার দেশকে বিশ্বের বুকে মর্যাদাবান দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ‘দুর্নীতির’ অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অনেক অপবাদ দেওয়া হয়েছে। আমি (প্রধানমন্ত্রী) চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছিলাম, কোনো দুর্নীতি হয়নি। আমি শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুর কন্যা। আমি কোনো দুর্নীতি করতে আসিনি। আমি এসেছি মানুষের কল্যাণ করতে। অথচ বিশ্বব্যাংক মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল। আমরা বলেছিলাম নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করবো। কেবল পদ্মা সেতু নয়, রেল সেতুও করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের উন্নয়নচিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ সামনের দিকে এগোয়। আর এরা (বিএনপি-জামায়াত) পেছন দিকে হাঁটে। কথায় আছে ‘ভুতের পা পেছন দিকে চলে’। বিএনপি-জামায়াত জোট অদ্ভুতভাবে ক্ষমতায় আসে। আর ক্ষমতায় এসে ভুতের মতো দেশ চালায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা মানিলন্ডারিং করে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন। খালেদা জিয়ার এক ছেলে ঘুষ দুর্নীতি করে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন। আমেরিকার এফবিআই এসে সাক্ষ্য দিয়ে গেছে। আরেক ছেলে সিঙ্গাপুরে টাকা পাচার করেছে। সেই টাকা সরকার ফেরৎ এনেছে। এই গেল দুই ছেলে। মা-ও কম যান না। মা খালেদা জিয়া এতিমের নামে টাকা এনে টাকা মেরে খেয়েছেন। যারা এতিমের টাকা মেরে খায়, জনগণের টাকা বিদেশে পাচার করে- তারা আবার কোন মুখে কথা বলে?

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি বাঙালি জাতিকে বিশ্বে মর্যাদা এনেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। যশোরের উন্নয়নে সরকার গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যশোরবাসীর কল্যাণে অনেকগুলো উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করে সেগুলো উপহার দিয়ে গেলেন তিনি। একই সঙ্গে গত নির্বাচনে যশোরের ছয়টি আসনের সবকটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিজয়ী করায় যশোরবাসীকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।

আগামী নির্বাচনের জন্য প্রধানমন্ত্রী জনসভায় উপস্থিত লাখো মানুষের কাছে নৌকায় ভোট দেওয়ার অঙ্গিকার চাইলে জনতা দুই হাত তুলে তার প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দেশ চালায়। তারা বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ে তুলবে। তারা দেশকে শান্তি-শৃঙ্খলার দেশে পরিণত করবেন। একমাত্র আওয়ামী লীগই সেটা পারে।

যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলম মিলনের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য, মাহবুব-উল আলম হানিফ, আবদুর রহমান, বীরেন সিকদার, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, এসএম কামাল হোসেন, পংকজ দেবনাথ, নাজমা আক্তার, সাইফুর রহমান সোহাগ, শেখ আফিল উদ্দিন, কামরুন্নাহার লায়লা জলি, কাজী নাবিল আহমেদ, রনজিৎ রায়, মনিরুল ইসলাম মনির, স্বপন ভট্টাচার্য, অ্যাডভোকেট জহুর আহমেদ, আবদুল মজিদ, জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু প্রমুখ। পরিচালনা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার।

Please follow and like us:
0