মোগল বাদশাহির শেক্সপিয়ার

২৭ ডিসেম্বর ছিল মির্জা গালিবের ২২০তম জন্মবার্ষিকী। অনেকেই বলেন, মোগল সংস্কৃতির দুটি শ্রেষ্ঠ উপহারের একটি তাজমহল, অন্যটি মির্জা গালিব। গুগল এবার এ বিখ্যাত কবির জন্মদিনে ডুডল তৈরি করেছে। শেক্সপিয়ার ইংরেজি ভাষার জন্য যা করেছেন, উর্দুর জন্য তা করেছেন মির্জা গালিব।

গালিব ছিলেন শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের প্রিয়ভাজন ও তার দরবারের কবি। বাহাদুর শাহ ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে গালিবকে দাবির-উল-মুলক উপাধিতে ভূষিত করেন। দরবারে কাব্যচর্চার পাশাপাশি গালিব সম্রাটের বড় ছেলে শাহজাদা ফখর-উদ-দিনের শিক্ষকও ছিলেন। সম্রাট গালিবকে মোগল দরবারের ইতিহাসবিদ হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন।

তার পুরো নাম মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ। জন্ম ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর আগ্রায়। ১ বছর বয়সে গালিবের কবিতা লেখায় হাতেখড়ি। বেড়ে উঠেছেন ফার্সি, উর্দু, আরবি ভাষার মধ্য দিয়ে। অবশ্য খ্যাত হয়েছেন উর্দুতেই।

দুনিয়াকে গালিব শিশুদের খেলার মঞ্চ হিসেবে দেখতেন, যেখানে রাত-দিন নানা খেলা পরিবেশিত হচ্ছে। তার মনে হয়েছিল জীবনই সবচেয়ে বড় কারাগার। ভাষা গালিবের কোনো বাধা নয়, উর্দুতে মূল কবিতা কিংবা অন্য কোনো ভাষায় তার অনুবাদ, যেটাই পাঠক পড়ুন না কেন হূদয়ে ঝঙ্কার তুলবেই। জীবনে গালিব বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছেন। অর্থাভাব, সিপাহি বিপ্লব— সবই তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সিপাহি বিদ্রোহ নিয়ে রচনা করেন ‘দস্তঁবু’। এর ভাষায় তিনি এমন কুহেলিকা তৈরি করেছিলেন, যা সে সময়ের সেরা উর্দু পণ্ডিতের পক্ষেও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব ছিল না। গালিবের জীবনের নানা ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়াকে বোঝাও সহজ নয়।

দুই শতক পরেও গালিব এ উপমহাদেশে দারুণ সজীব। বিশেষত বলিউডের সংলাপ, গানে গালিবের কবিতার দেখা পাওয়া যায়। ২০০১ সালে দিল সে সিনেমায় শাহরুখ খান ও মনীষা কৈরালার একটি গানে গালিবের পঙিক্ত ব্যবহূত হয়েছিল। আবার কিছুদিন আগে সালমান খানের ব্লকবাস্টার সিনেমা কিক-এ খলচরিত্রে অভিনয় করা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীর মুখে শোনা গিয়েছিল গালিবের কবিতার কয়েকটি লাইন। গত শতকের আশির দশকে বিশিষ্ট অভিনেতা নাসিরউদ্দীন শাহের অভিনয় গালিবকে নতুন করে মানুষের সামনে হাজির করে। কবি, পরিচালক গুলজারের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় তৈরি হয়েছিল গালিবের জীবনী সিরিজ। গালিবের গজলে কণ্ঠ দিয়েছিলেন জগজিৎ সিং।

কিংবদন্তীয় কবি, পরিচালক গুলজার গালিবের কাব্যে প্রেরণা খুঁজে পান। তার মতে, গালিব দারুণ আত্মাভিমানী ছিলেন এবং তিনি অন্যদের চেয়ে ভিন্ন হওয়াটা উপভোগ করতেন। ‘গালিব আত্মাভিমানী ছিলেন। তিনি এটা জানতেন এবং বিষয়টি নিয়ে খুশিই হতেন। আমার মনে হয় এই বড়াই করাটা তার জন্য ঠিক ছিল। সমসাময়িক কবিরা যখন ফার্সি ভাষায় লিখছেন গালিব তখন বেছে নিয়েছিলেন উর্দু, সাধারণ মানুষের ভাষা।’ গুলজারের মতে, গালিব সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, কেউ উর্দু ভাষা না জানলেও তার গালিব সম্পর্কে জানা উচিত। কয়েক বছর আগে ২১৪তম জন্মদিনে গালিবের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করেছিলেন গুলজার। গালিবকে নতুনদের সামনে তুলে ধরতে তিনি সবসময় কাজ করছেন। ‘গালিবের কবিতা, জীবনযাত্রা, ব্যবহার সবই বিরাট প্রেরণার উত্স। যখন মানুষ ঘাড়ে করে নিজের ধর্ম বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে, গালিব তখন মানবতার কথা বলেছেন।’ গুলজারের কথায়, শায়েরির দুনিয়া দুই ভাগে বিভক্ত— গালিবের আগে ও পরে।

গালিব তার সাতটি সন্তানকে হারিয়েছেন। এমন শোক বুকে নিয়েও দুনিয়াকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা বন্ধ রাখেননি। ইতিহাসবিদ সোহাইল হাশমির মতে, গালিব যদি ইংরেজি ভাষায় লিখতেন, তাহলে নোবেল পেয়ে যেতেন। বিশিষ্ট উর্দু সাহিত্য বিশারদ প্রয়াত ব্রিটিশ অধ্যাপক রালফ রাসেল বলেছিলেন, ‘গালিব যদি ইংরেজিতে লিখতেন, তাহলে সর্বকালের, সব ভাষার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি বলে বিবেচিত হতেন।’

১৮৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গালিব দিল্লিতে চাঁদনী চকের কাছে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। বাড়িটি এখন জাদুঘর এবং গালিব কি হাভেলি নামে বিখ্যাত।

Please follow and like us:
0