বিএনপি না হয় গেল-আওয়ামী লীগ থাকবে তো!- মইনুল হোসেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার সাম্প্রতিক আফ্রিকা সফরকালে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন। এতে সরকারের ব্যর্থতার কথা যারা বলেন তাদের উদ্দেশে সরকারের স্তাবকরা ওবামার প্রশংসার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন। অবশ্য তারা ওবামার বক্তব্য উদ্ধৃত করা থেকে বিরত রয়েছেন।
প্রকৃতপক্ষে ওবামা বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন, তবে সরকারের নয়- জনগণের। যদিও সরাসরি বাংলাদেশের পরিস্থিতি আলোচনায় আসেনি। আসলে নির্বাচন সংক্রান্ত পরিস্থিতির উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে। তিনি তার বক্তৃতায় সেসব নীতি-আদর্শের পক্ষে কথা বলছিলেন যেগুলো উন্নয়নের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং যার অনুসরণ আফ্রিকার জন্য অপরিহার্য। আফ্রিকা তার অতীতের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসুক এবং সেখানে এখন যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে তাকে কাজে লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়াক- এ কথাই তিনি বলছিলেন।
সত্যি সত্যিই তিনি বাংলাদেশের জনগণের প্রশংসা করছিলেন কারণ, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ধ্বংস করে ভবিষ্যৎ অনিরাপদ করার বিরুদ্ধে তারা সৎ নির্বাচন ফিরিয়ে আনার লড়াই করছেন। কিন্তু কূটনৈতিকভাবে তিনি জিম্বাবুয়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে থাকবেন সম্ভবত আমাদের দেশে বিদ্যমান গণতন্ত্রের কথা মাথায় রেখে। সত্যিকারের উন্নয়ন এবং সুশাসনের জন্য অবাধ ও নিয়মিত নির্বাচন যে অপরিহার্য, এ কথাই ওবামা উচ্চকণ্ঠে বলেছেন। কেনিয়ায় তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছেন, সেই বক্তৃতায় তিনি জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় রেখে একটি দেশ তার শক্তি-সামর্থ্যরে সর্বোত্তম ব্যবহার করে সার্থক অগ্রগতির পথে অগ্রসর হতে পারে, এ কথাই তিনি জোর দিয়ে বলেছেন।
তার দীর্ঘ বক্তৃতায় বাংলাদেশের ব্যাপারে একটিমাত্র বাক্য লক্ষ্য করা গেছে যেখানে উন্নয়নের জন্য উদ্যোক্তাদের উদ্যোগী ভূমিকা কীভাবে বিভিন্ন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায় সেকথা বলতে গিয়ে তার শ্রোতাদের বলেছেন : ‘জিম্বাবুয়ে থেকে বাংলাদেশ, যেখানে নাগরিক সমাজ নির্বাচনকে নিরাপদ রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে …।’
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যে আগ্রহ ও সচেতনতা দৃশ্যমান তার স্বীকৃতি ও প্রশংসা ভাষা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কণ্ঠে। বিদ্যমান রাজনীতিতে যার ব্যবহারিক গুরুত্ব হচ্ছে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নিরাপদ অবস্থান থেকে দূরে রয়েছে।
কেউ অবশ্য এ কথাও বলতে পারেন যে, প্রেসিডেন্ট ওবামা জিম্বাবুয়ের উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশে কী ধরনের গণতন্ত্র বিরাজ করছে, আদতে সেটাই বুঝাতে চেয়েছেন। এটা লজ্জার ব্যাপার যে, সব ব্যাপারেই জিম্বাবুয়ের রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের সাদৃশ্য বিরাজ করছে। ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করার জন্য যারা অন্য সবাইকে গণবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত করতে দ্বিধা করে না, তাদের সততা ও দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। বাস্তবে সহযোগিতা পাচ্ছে সব শ্রেণীর মধ্যকার কিছু দুর্নীতিপরায়ণ ও বিবেকহীন লোক। প্রেসিডেন্ট মুগাবে আজীবন ক্ষমতায় থাকাটাই বড় করে দেখছেন। দেশ-বিদেশে মুগাবে সরকারের মানবতাবিরোধী নির্যাতনের শাসন ধিকৃত হচ্ছে। জিম্বাবুয়ে যেন স্বাধীন হয়েছে প্রেসিডেন্ট মুগাবের অধীনে পরাধীন থাকার জন্য।
দেখা যাক, জিম্বাবুয়েতে প্রেসিডেন্ট মুগাবের কী ধরনের গণতন্ত্র বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এক রিপোর্টে প্রকাশ, ২০০০ সালের শাসনতান্ত্রিক গণভোটে পরাজয়বরণ করার পর জিম্বাবুয়ের রাজনীতি থেকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিদায় নিয়েছে। সেখানে আর গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার অস্তিত্ব নেই, বিচার বিভাগের নেই কোনো স্বাধীনতা, আইনের শাসনের নেই নাম-গন্ধ, জাতিগত বৈষম্য ও বৈরিতা প্রকট রূপ নিয়েছে, স্বাধীন গণমাধ্যমের কোনো অস্তিত্ব নেই, সুশীল সমাজ ও বিদ্যোৎসাহী সমাজ বাকরুদ্ধ অথবা অস্তিত্বহীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ব্যাপক রূপ নিয়েছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধির সঙ্গে বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনীতিকীকরণ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রেসিডেন্ট ও সরকার পক্ষের রাজনীতিকদের বিবৃতিতে বলা হচ্ছে, দেশে একটা যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। সেখানে বিরোধীদলীয় রাজনীতিকরা একটা গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আনতে সংগ্রাম করছে। সরকারের সঙ্গে সুর মেলাতে না পারলে সংবাদপত্রকে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। বিচার বিভাগের সদস্যদের হুমকি দেয়া হচ্ছে অথবা গ্রেফতার করা হচ্ছে। বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরুদ্ধে আইন করা হচ্ছে এবং মুখ চিনে তা প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিরোধী সদস্যদের নিয়মিত গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে। অনেকে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, আবার অনেককে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হচ্ছে। বিচার ব্যবস্থার ওপর হুমকি বেড়েই চলেছে। গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন (এমডিসি) নামের সংগঠনটি বারবার বিচার ব্যবস্থার সাহায্য নিয়ে সরকার পক্ষকে (জেএএনইউ-পিএফ) চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছে এবং আদালত প্রায়ই এমডিসি’র পক্ষে রায় দিলেও পুলিশ তা আমলে নিচ্ছে না।
বাংলাদেশেও আমরা দেখতে পাচ্ছি একশ্রেণীর চাটুকার সরকারের ভেতরে ও বাইরে বিদ্যমান বিশৃংখল বাস্তবতাকে লুকানোর চেষ্টা করছে, তারা সরকারের কাজকর্ম জনগণকে মূল্যায়ন করতে দিচ্ছে না। তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যর্থতা উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে উন্নয়নের অনুসরণীয় মডেল হিসেবে প্রচার করছে। যারা নিজেদের দুর্নীতি ও অযোগ্যতাকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে ধর্তব্যে এনে লাভবান হচ্ছেন, তারা তো এ রকম দাবি করতে পারেনই। তাদের কথা ভিন্ন। সরকারের ব্যর্থতার জন্য শুধু অর্থনীতিবিদরা নন, ব্যবসায়ীরাও সার্বিক অচলাবস্থার মধ্যে হা-হুতাশ করছেন। পুলিশি শাসনের ভয়-ভীতির ওপর ভর করে সরকার টিকে আছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির অস্তিত্বই থাকবে না। বিএনপিকে শেষ করার জন্য পুলিশি ক্ষমতা তো ব্যবহার করা হচ্ছেই। রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে শেষ করতে না পারার ব্যর্থতা তো রাজনীতিবিদ হিসেবে সৈয়দ আশরাফ অস্বীকার করতে পারবেন না। কোনো দলকে পুলিশ দিয়ে শায়েস্তা করা আর যা-ই হোক রাজনীতি নয়। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতা হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী কমিউনিস্ট পার্টিকে আইন করে ব্যান্ড করার বিরোধিতা করেছেন এই বলে যে, কমিউনিস্ট পার্টিকে মোকাবেলা করতে হবে রাজনৈতিকভাবে। জিম্বাবুয়ের রাজনৈতিক মডেল পুলিশি শাসনের মডেল- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার মডেল নয়। সেখানেও পুলিশ দিয়ে বিরোধী রাজনীতিকে অস্তিত্বহীন করা হচ্ছে।
দুঃখ লাগে যখন দেখি যে, একশ্রেণীর আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে এ কথা বলে উৎসাহ দেখাচ্ছেন, কিন্তু তারা দেখছেন না আওয়ামী লীগের অবস্থা এরই মধ্যে কতটা সঙ্গিন হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারা ভাবতে পারছেন না যে, আওয়ামী লীগের আদর্শিক মৃত্যু হয়ে গেছে। মা ও ছেলের রাজনীতি করতে গিয়ে বিএনপিও অস্তিত্বের সংকটে আছে। তবে বিরোধী দলের রাজনীতি থাকবে বিএনপি শেষ হয়ে গেলেও। আসলে রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। দেশে সুস্থ রাজনীতি না থাকলে কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব বা কর্তৃত্ব কিছুই থাকে না।
জনসমর্থনভিত্তিক নির্বাচনের জন্য রাজনীতিবিদদের এ সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো আশু সম্ভাবনাও দেখছি না। নির্বাচনবিহীন আমলাতান্ত্রিক শাসনের সহযোগী হিসেবে আওয়ামী লীগের টিকে থাকাটা আওয়ামী লীগের জন্য সত্যিকার টিকে থাকা নয়। যে আওয়ামী লীগকে জনগণের ভয়ে মূলত পুলিশ ও আমলাদের কারসাজির ভোটারবিহীন নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে, সে আওয়ামী লীগের নিজের ভবিষ্যৎ কী সেটা ভাবাই তো কাজের কাজ।
নির্বাচনের মাধ্যমে অর্থাৎ জনসমর্থনের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার গঠনের ব্যবস্থার মধ্যে নিরাপত্তা থাকে অনেক বেশি। সরকার পরিবর্তনের নিশ্চিত ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে পারে। যারা মানুষের স্বাধীনতার সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে কেবল উন্নয়নের কথা শোনাচ্ছেন, তাদের কোনো যোগ্যতার স্বাক্ষর তো কেউ দেখছে না।
গণতন্ত্রের ধ্বনি তুলে সরকার যেসব কর্মকাণ্ড করছে তা তারা আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়ের কর্মধারার সঙ্গে তুলনা ও পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। বস্তুত, সরকার জিম্বাবুয়ের মতো কোনো দেশ থেকে বামপন্থী একনায়কত্ববাদী নীলনকশা ধার করে এনে তার আলোকে দেশ চালাচ্ছে। এ রাজনীতি তো আওয়ামী লীগের রাজনীতি নয়। তাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কীভাবে গর্ব করতে পারে যে, দেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি চলছে। বিএনপি মারা যাচ্ছে, আর আওয়ামী লীগ দাবি করছে তারা জীবিত আছে। ক্ষমতায় থাকলেই কোনো রাজনৈতিক দলের জীবিত থাকা হয় না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে তার সাম্প্রতিক পারিবারিক সফরকালে দাবি করলেন যে, তিনি ওয়েস্টমিনিস্টার ধরনের গণতন্ত্র অনুসরণ করছেন। কিন্তু তার উপদেষ্টারা এ ব্যাপারে তাকে ভুল পরামর্শ দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি অজ্ঞাতসারে জিম্বাবুয়ের মতো স্বৈরশাসনের চর্চা করছেন। কিন্তু তিনি ভালো করেই জানেন যে, নির্বাচনকে অবাধ ও নিরাপদ করার সামর্থ্য তার নেই। কারণ, গণতন্ত্রের জায়গায় কর্তৃত্ব করছে দুর্নীতি। বিএনপির মাতা ও পুত্রের রাজনীতির ভীতি তার থাকার কথা নয়। তার আসল ভয় হচ্ছে তার নিজের জনগণ।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
[email protected]

সূত্র: hardnews24.com

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *