ফিরোজের প্রতিপক্ষ আ’লীগের ৮ নেতা

ঢাকা-৬ (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) আসনে গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি নির্বাচিত হলেও মহাজোটের শরিক এই দলটির সাংগঠনিক অবস্থান একেবারেই দুর্বল। বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদের জনসমর্থন সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। জাপার এই সাংগঠনিক ‘দুর্বলতা’ ও ‘জনসমর্থনহীনতার’ সুযোগ নিয়ে আগামী নির্বাচনে আসনটি নিজেদের কব্জায় নিতে চায় মহাজোটের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগ।

এ লক্ষ্য নিয়ে কাজী ফিরোজ রশীদের বিপরীতে মহাজোটের মনোনয়ন পেতে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগের আট সম্ভাব্য প্রার্থী। তারা হচ্ছেন- দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবু আহামেদ মন্নাফী, সহসভাপতি ও কেএল জুবিলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সমরেন্দ্র নাথ রায় সমর, সাংগঠনিক সম্পাদক হেদায়েতুল ইসলাম স্বপন, সূত্রাপুর থানা সভাপতি ও সাবেক কমিশনার হাজি মো. সাহিদ, ওয়ারী থানা সভাপতি চৌধুরী আশিকুর রহমান লাভলু, গেণ্ডারিয়া থানা কার্যনির্বাহী সদস্য (প্রস্তাবিত) ও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সাইদুর রহমান প্যাটেল, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের একাংশের সভাপতি ও চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুক এবং যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এইচ এম রেজাউল করিম রেজা।

এ ছাড়া ১৪ দলের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ নাভেদ হোসেন জোটের মনোনয়ন চান। তিনি জাসদের অঙ্গ সংগঠন জাতীয় যুব জোটের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক।

পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, ওয়ারী ও কোতোয়ালি থানার একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-৬ আসন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনভুক্ত এসব থানার ৩৪, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫ ও ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড এ আসনে পড়েছে। গত নির্বাচনে এখানে জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ লাঙ্গল প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হন। মহাজোটগত সমঝোতার কারণে জাপা প্রার্থীর সমর্থনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মিজানুর রহমান খান দীপু। নির্বাচনের কিছুদিন পরই মারা যান তিনি। দীপু ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী সাদেক হোসেন খোকাকে হারিয়ে এখানকার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ আবারও মহাজোটের ব্যানারে নির্বাচন করতে চাইছেন। ছাত্রলীগ-যুবলীগ হয়ে নব্বইয়ের দশকে জাতীয় পার্টিতে আসা দলটির হেভিওয়েট এই নেতা ঢাকা-৬ থেকে গত নির্বাচনেই প্রথমবার এমপি হয়েছেন। এর আগে এরশাদ সরকারের সময় গোপালগঞ্জ থেকে একাধিকবার এমপি হয়েছিলেন তিনি। সজ্জন ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ এবং সুবক্তা হিসেবে পরিচিতি রয়েছে তার। তবে এ আসনে তার দলের সাংগঠনিক অবস্থা খুবই নাজুক, ভোটও হাতেগোনা। ২০১৫ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাপা সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এই আসন বটেই, পুরান ঢাকার আট থানা মিলিয়ে দুই হাজার ভোটও পাননি। পক্ষান্তরে, আসনভুক্ত ১১টি ওয়ার্ডের আটটিতেই কাউন্সিলর নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। ফলে দলীয় এমপি থাকলেও সাংগঠনিক শক্তি না থাকায় মূলত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর ভর করে টিকে আছে জাপা।

অন্যদিকে, কাজের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকার অভিযোগও রয়েছে কাজী ফিরোজ রশীদের বিরুদ্ধে। সুসম্পর্ক গড়ে না ওঠায় তার ওপর সন্তুষ্ট নন স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী। এ কারণে আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চাইছেন তারা।

নিজ দলের সাংগঠনিক নাজুক অবস্থার কথা অকপটে স্বীকার করে কাজী ফিরোজ রশীদ সমকালকে বলেছেন, জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা এখানে ততটা ভালো না হওয়ায় বড় দল আওয়ামী লীগের সমর্থন ছাড়া তাদের পক্ষে জেতা সম্ভব নয়। তবে এটাও ঠিক, জাপা ও আওয়ামী লীগ এক থাকলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বর্তমান সরকারের অবস্থান শক্তিশালী হয়। কাজের ক্ষেত্রে সুবিধাও হয়।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও মানুষের সঙ্গে তার ভালো যোগাযোগ রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, তিনি এলাকার যে উন্নয়ন করেছেন, তা বিগত অনেক এমপির সময় হয়নি। আবারও জাতীয় পার্টি তথা মহাজোটের মনোনয়ন চাইবেন তিনি। তবে যাকেই মহাজোটের মনোনয়ন দেওয়া হোক, তার দল ও নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সিদ্ধান্ত মেনে মহাজোট প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করবেন তিনি।

আবু আহামেদ মন্নাফী বলেন, গত ৫০ বছর একই নীতি ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে জনকল্যাণের রাজনীতি করে আসছেন তিনি। নেত্রী (শেখ হাসিনা) ও দল তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি জিতে আসতে পারবেন বলে আত্মবিশ্বাস রয়েছে তার। তিনি বলেন, এখানে জাতীয় পার্টির সর্বসাকল্যে এক-দেড় হাজার ভোট রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বারবার নৌকার ভোট নষ্ট করতে চাইছেন না বলে জাপা প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায়ও আগ্রহী হবেন না। এখানে বিএনপিরও ভালো ভোট রয়েছে। তাই জাপা প্রার্থীকে আবারও মনোনয়ন দেওয়া হলে সবাই মিলে কাজ করেও তাকে জেতাতে পারবেন বলে মনে হয় না।

অধ্যক্ষ সমরেন্দ্র নাথ রায় সমর বলেন, সত্তর দশক থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকায় দলে তার অবদান রয়েছে। দীর্ঘদিন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেএল জুবিলী স্কুল ও কলেজের প্রধান হিসেবে কর্মরত থাকায় এলাকার মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও ক্লিন ইমেজ গড়ে উঠেছে তার। মাঠজরিপ ও জনপ্রিয়তার বিচারে তাকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে তার বিশ্বাস।

হেদায়েতুল ইসলাম স্বপন বলেন, জনকল্যাণের জন্যই রাজনীতি ও দল করেন তিনি। এ জন্যই প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ও দলীয় অবস্থান গড়ে তুলতে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। মনোনয়ন পেলে বিশাল কর্মীবাহিনীর সহযোগিতায় নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করবেন। তিনি বলেন, এলাকায় কাজ করার ক্ষেত্রে বর্তমান এমপি তাদের সঙ্গে সমন্বয় রাখেন না। আওয়ামী লীগের থানা-ওয়ার্ড নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগও আশানুরূপ নয়।

হাজি মো. সাহিদ বলেন, জাপার এমপির সময় এলাকার উন্নয়ন খুব কমই হয়েছে। উন্নয়নকাজ ভালোভাবে হওয়ার স্বার্থে এলাকাবাসী ও নেতাকর্মীরা এবার ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী চাইছেন। এ ক্ষেত্রে তার (হাজি সাহিদ) যোগ্যতা ও দক্ষতা দলীয় অন্য প্রার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘদিনের রাজনীতি ও কমিশনার থাকার সুবাদে এলাকার উন্নয়নে অনেক অবদানও রেখেছেন তিনি। এ বিবেচনায় তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে তার বিশ্বাস।

চৌধুরী আশিকুর রহমান লাভলু বলেন, ছাত্রলীগ থেকে রাজনীতির মাধ্যমে আজকের পর্যায়ে উঠে এসেছেন তিনি। দল তার কাজের মূল্যায়ন করে তাকেই মনোনয়ন দেবে বলে তার প্রত্যাশা। তিনি বলেন, বর্তমান এমপি ভালো মানুষ। ডাকলে সভা-সমাবেশ ও অনুষ্ঠানাদিতে আসেনও। তবে তার সময় এলাকায় দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম চোখে পড়ে না।

সাইদুর রহমান প্যাটেল বলেন, এই এলাকায় আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পেছনে তার অবদান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার লক্ষ্যেই দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন তিনি। জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা বিবেচনায় দল থেকে তাকেই আগামী নির্বাচনের প্রার্থী করা হবে বলে আশাবাদী তিনি।

আকবর হোসেন পাঠান ফারুক বলেন, বাল্যকাল থেকে তার জীবন কেটেছে এই এলাকায়। আটান্ন বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে আছেন তিনি। দল উপযুক্ত মনে করলে তাকে এ আসনের মনোনয়ন দেবে বলে আশা করছেন তিনি।

এইচ এম রেজাউল করিম রেজা বলেন, বর্তমান এমপি জাপার বড় নেতা হলেও এটি তার নিজস্ব এলাকা নয়। এলাকার মানুষের সমস্যায় তাকে পাশে পাওয়াও যায় না। আবার আওয়ামী লীগ থেকে স্থানীয় ও ভালো প্রার্থী সেভাবে নেই। আর তিনি (রেজা) এখানেই বড় হয়েছেন, ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন। এলাকাবাসীর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই এই আসনে দলীয় প্রার্থী দেওয়া হলে তিনিই মনোনয়ন পাবেন বলে আশাবাদী তিনি।

জাসদের সৈয়দ নাভেদ হোসেন বলেন, ২৭-২৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ছাত্র ও যুব রাজনীতি হয়ে এখন জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত তিনি। মানুষের কল্যাণ বিশেষ করে বেকার যুবসমাজের স্বার্থে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তিনি। এই লক্ষ্যপূরণে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চান। ১৪ দল থেকে মনোনয়ন পেলে সবার সমর্থনে জিতে আসবেন বলে দৃঢ়বিশ্বাস তার। তবে মনোনয়ন না পেলেও যাকেই প্রার্থী করা হোক না কেন, ১৪ দলের সিদ্ধান্ত মেনে তার পক্ষেই কাজ করবেন তিনি।

Please follow and like us:
0