নিরাপদ ও যুগোপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা; প্রেক্ষিত: উন্নতবিশ্ব ও বাংলাদেশ

খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার সালের দিকে মেসোপটেমিয়া বা বর্তমানে ইরাক-এ প্রথম চাকা আবিস্কৃত হয় এবং তার তিনশত বছরের মধ্যেই প্রথম যোগাযোগ ব্যবস্থায় চাকার অন্তর্ভুক্তি আসে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় চাকার প্রচলন যেমন সভ্যতার নতুন অধ্যায় শুরু করেছিলো তেমনি বোধকরি রাস্তায় দুর্ঘটনা নামক এক ব্যাধির ভ্রুন তখনই সৃষ্টি হয়েছিলো! চাকার আবিস্কার ও যানবাহনে এর ব্যবহার শুরুরও অনেক পরে, ১৮৯৬ সালের ৩০শে মে প্রথম নিউ-ইয়র্ক সিটিতে রোড এক্সিডেন্ট বা রাস্তায় দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয় যেটা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম যানবাহন দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হিসাবে পরিগনিত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় যাতায়াতের সুযোগ সুবিধা যেমন বেড়েছে দুর্ঘটনার সংখ্যাও ভয়াবহ চিত্র আকার ধারন করেছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, সংখ্যার উপর ভিত্তি করে প্রথম দশটি প্রধান মানব মৃত্যুর কারনের ভিতরে রোড ট্রাফিক ইনজুরি বা যাতায়াতঘটিত দুর্ঘটনা ইতোমধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে জায়গা করে নিয়েছে। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ১৩ লক্ষ লোক রোড একসিডেন্ট বা রাস্তায় দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং ২ থেকে ৫ কোটি লোক কোনভাবে আহত বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩২৮৭ জন মানুষ রোড একসিডেন্টে মারা যাচ্ছে যার অর্ধেকের বেশিই তরুন, বয়স ১৫ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে। অমূল্য প্রাণের পাশাপাশি এই সকল দুর্ঘটনার টাকায় ক্ষতির হিসাবটাও কম নয়, অঙ্কে প্রায় ৫১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি, যা দেশ ভেদে ১-২% জিডিপি-র সমান। পরিসংখ্যান বলে এই মৃত্যু ও ক্ষতির পরিমান বাংলাদেশের মত মধ্যম ও নিন্ম আয়ের দেশে তুলনামূলক বেশি যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং এর হার অপরিবর্তিত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ ট্রাফিক ইনজুরি প্রথম পাঁচটি প্রধান মৃত্যুর কারনের মধ্যে অন্যতম প্রধান হিসাবে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
হতাহতের এই ভয়বহ চিত্রটি তুলে ধরে সতর্ক করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সহ বেশ কিছু সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। একই সাথে উন্নতবিশ্ব তাদের ট্রান্সপোর্টেশন বা যোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিকায়নের পাশাপাশি সেফটি বা নিরাপদ চলাচলের দিকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেনো হচ্ছে এতো দুর্ঘটনা আর ক্ষয়ক্ষতি? বিভিন্ন গবেষনা রিপোর্টে এর কারনগুলো সুস্পষ্টভাবে সনাক্ত করা হয়েছে। কারনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দুর্ঘটনার উৎস মুলত দুই ধরনের, প্রথমত চালককেন্দ্রিক এবং দ্বিতীয়ত অবকাঠামোকেন্দ্রিক। দেখা যায় উন্নত দেশগুলোতে চালক কেন্দ্রিক সমস্যাই প্রধান। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একটি চ্যারিটি সংস্থা ইনিস্টিটিউট অব এডভান্স মটোরিস্ট-এর রিপোর্ট অনুযায়ী উন্নত দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৬৫% সড়ক দুর্ঘটনার কারন হিসাবে শুধুই চালকের ভুলকেই দায়ী করা হয় যেমন অমনোযোগী ড্রাইভিং, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো ও মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো সর্বাগ্রে। বাকি দুর্ঘটনার জন্য কখনো কখনো চালক ও অবকাঠামোর সম্মিলিত সম্পর্ক দায়ী আবার কখনো শুধুই অবকাঠামো দায়ী। বাংলাদেশসহ অন্যন্য উন্নয়নশীল দেশ বা অনুন্নত দেশের জন্য চিত্রটা ঠিক বিপরীত। বাংলাদেশ, ভারত কিংবা চীনে সড়ক দুর্ঘটনার সিংহভাগের জন্যই দুর্বল অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা দায়ী।
বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার শুধুমাত্র সাউথ ইস্ট এশিয়ার দেশগুলোর উপর করা এক জরিপ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে রোড সেফটি ম্যানেজমেন্টের উপর জাতীয় পরিকল্পনা আছে যেটা তদারকি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়, কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেই কোন নির্ধারিত ফান্ড বা অর্থায়ন। একই সাথে জরিপটি আরো আটটি ক্যাটাগরিতে অন্যান্য দেশের সাথে এক তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে যেখানে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে আমাদের দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত দূর্বলতা ও প্রয়োজনীয় সেফটি বা সতর্কতা ব্যবস্থার অভাব। রোড সেফটি ব্যবস্থাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, একটিকে বলা হয় একটিভ সেফটি ব্যবস্থা আর অন্যটি পেসিভ সেফটি ব্যবস্থা। পেসিভ সেফটি ব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম, হেলমেট, সিট বেল্ট ও বাহনে ইয়ার ব্যাগের ব্যবহার। কিন্তু বাংলাদেশে এগুলো ব্যবহারের জন্য কোন প্রনোদনা বা আইনের প্রয়োগ নেই। দুর্ঘটনা পরবর্তী ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম যেমন ফরমাল প্রি-হসপিটাল কেয়ার সিস্টেম, সেটার প্রচলনও বাংলাদেশে নেই। অথচ উন্নত দেশে তো বটেই আমাদের প্বার্শবর্তী দেশ ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং মায়ানমারেও উল্লেখিত ব্যবস্থাগুলো রয়েছে।
এবার দেখা যাক উন্নতদেশগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা কেমন। যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য উন্নত দেশে পাবলিক ট্রান্সপোর্টগুলোর ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ি থাকলেও জনসাধারন মূলত পাবলিক পরিবহনেই কর্মস্থালে যাতায়াত করে। কেননা, পাবলিক পরিবহনে খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম, একই সাথে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলকে নিরুৎসাহিত করতে নিজেস্ব কার পার্কিং ফি দেশগুলোতে অনেক বেশি। যার ফলাফল হিসাবে অনেকটা পরিকল্পিতভাবে রাস্তায় গাড়ি চলাচল করে যার দরুন যানজট কিংবা দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেকাংশেই কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, একটি পরিকল্পিত যানজট মুক্ত নগরীর জন্য তার ২৫% থেকে ৩০% জায়গা যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য থাকা উচিত। উন্নতদেশের শহরগুলো সেটা নিশ্চিত করেছে পর্যাপ্ত রাস্তা তৈরিসহ ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরির মাধ্যমে। রাস্তায় নিরাপত্তার জন্য তাদের রয়েছে যথাযথ ব্যবস্থা, আইন ও তার প্রয়োগ। আইন মেনে চলার জন্য জনসাধারনের মধ্যে একধরনের সচেতনতাও দেশগুলোর সরকার তৈরি করছে, যে জন্য জনসাধারন ট্রাফিক সিগনাল মেনে চলা সহ, সিটবেল্ট বাধা কিংবা হেলমেট ব্যবহারে প্রনোদিত হয়। এসকল পেসিভ সেফটি ব্যবস্থার পাশাপাশি একটিভ সেফটি ব্যবস্থা যেমন, প্রি কলিশন ওয়ার্নিং বা সংঘর্ষের পূর্বে কিভাবে চালককে সতর্ক সংকেত দেওয়া যায় সেই ধরনের ব্যবস্থার প্রবর্তনও দেশগুলো করেছে। সাম্প্রতিকালে উন্নতবিশ্ব “ইন্টিলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম”- এর ব্যানারে পরিবহন ব্যবস্থায় বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার অভিপ্রায়ে বিভিন্ন গবেষনা প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছে। এই সকল গবেষনা প্রকল্পে দেশগুলোর সরকারসহ অনেক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন করে। এই প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে রাস্তায় চলাচলকে আরো নিরাপদ করা, চালককে সহায়তা করা এবং রাস্তার কর্মক্ষমতা বাড়ানো।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশে ইন্টিলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম বা সংক্ষেপে আইটিএস এর উপর গবেষনার পাশাপাশি কিছু কিছু আইটিএস সেফটি ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই প্রচলিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলাচলের সময় মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে আগেই প্রয়োজনীয় সংকেত সরবরাহ করা। তাছাড়া ওভারটেকিং ও লেন পরিবর্তনের সময় বাহন থেকে বাহনে সংকেতসহ নির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে বাহন যেন নিজে থেকেই চলাচল করতে পারে (এডাপটিভ ক্রুস কনট্রোল) সে ব্যবস্থা হয়েছে। এ সম্পর্কিত গবেষনা আর বিনিয়োগের মাধ্যমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমকে স্মার্ট করা হচ্ছে যেন চালক ভুল করলেও যে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত বাহন নিজে নিয়ে অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা এড়াতে পারে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রধান প্রধান নগরীতে ১০% থেকে ১৫% (ঢাকা শহরে ৭.৫%) জায়গা চলাচলের জন্য রাখা হয়েছে যার বেশির ভাগই সরু ও অপরিকল্পিত। বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত কার পার্কিং ফ্যাসিলিটিজ নেই, তাই যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এর মাধ্যমে যেমন যানজট তৈরি হচ্ছে, ঘটছে দুর্ঘটনা। সেফটি পরিকল্পনা থাকলেও তা শুধুই নথি আকারে, বাস্তবায়নের জন্য নেই বিশেষজ্ঞ দল কিংবা প্রয়োজনীয় নির্ধারিত অর্থায়ন।
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নতি বিভিন্ন বিষয়ের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে যার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে যোগাযোগ খাত। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটলে ব্যবসা-বানিজ্যের প্রসার ঘটে যার মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাই দেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় উন্নয়ন জরুরী। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের চাকাকে আরো গতিশীল করতে তাই যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন, যা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে এখনই শুরু করা উচিত।
লেখক: পিএইচডি গবেষক (ইন্টিলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম), কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া।

Please follow and like us:
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *