যুধিষ্ঠিরের পিছু পিছু স্বর্গ অবধি গিয়েছিল এক সারমেয়। এ বার সারমেয়র পিছু পিছু স্বর্গদ্বারে পাড়ি দিলেন এক যুবক।

এ স্বর্গদ্বার অবশ্য সে স্বর্গের দ্বার নয়। এ হল শ্রীক্ষেত্র বা পুরী। কলিকালের এ সারমেয়-লীলা মহাভারতেও নেই। আছে রেলের রিপোর্টে।

কেন? কুকুর রেলে চেপেই যাচ্ছিল যে!

রবিবার সকালে হাওড়া-পুরী এক্সপ্রেস হঠাৎ থমকে যায় ওড়িশার খুরদা রোড স্টেশনে। স্বাভাবিক ভাবেই খানিক ক্ষণ পর থেকে যাত্রীদের চেঁচামেচি শুরু। কিন্তু ট্রেন আর নড়ে না। নড়বে কী করে? কুকুরের টিকিট তো ওই খুরদা রোড পর্যন্তই। কুকুর নেমেছে স্টেশনে, কিন্তু মনিবের পাত্তা নেই। খোঁজ খোঁজ। মনিব ছাড়া কুকুরকে কার হাতে সঁপে দেওয়া হবে! অতএব পুরী এক্সপ্রেস ঠায় দাঁড়িয়ে খুরদা রোডেই। এ দিকে যাত্রীবিক্ষোভ বাড়তে থাকে। খবর যায় রেলের কন্ট্রোলরুমে। বেগতিক দেখে, মালিকহীন কুকুরসুদ্ধই ট্রেন পুরী নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রেল কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু কুকুরের সঙ্গে মনিবের বিচ্ছেদ হল কী করে? রেল সূত্রের খবর, কুকুরের মালিক সেনা-জওয়ান বীরসেন সুবুদ্ধি হাওড়া থেকে খুরদা রোডের টিকিট কেটেছিলেন পুরী এক্সপ্রেসে। পোষ্য কুকুর ‘স্নুপি’কে নিয়মমাফিক গার্ডের কামরায় উঠিয়েও দেন। ডগবক্স-এর ভিতরে বিছানা পেতে তাকে আরামসে শুইয়ে ফের প্ল্যাটফর্মে নামেন নিজের আসন যেখানে, সংরক্ষিত সেই কামরার খোঁজে। এর পরেই ঘটে বিপত্তি। সুবুদ্ধি তাঁর কামরায় পৌঁছনোর আগেই পুরী এক্সপ্রেস স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এ অঘটন যে ঘটেছে, পরের দিন সকালে ট্রেন খুরদা রোড পৌঁছনো অবধি ধরা পড়েনি। কুকুর গন্তব্যে পৌঁছেছে দেখে শুরু হয় মালিকের খোঁজ। শেষমেশ পুরী এক্সপ্রেস তো স্নুপিকে নিয়ে পুরীই পাড়ি দেয়।

পুরী এক্সপ্রেস খুরদা রোড ছেড়ে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক বাদেই সেখানে পৌঁছয় অমরাবতী এক্সপ্রেস। পুরী এক্সপ্রেসে উঠতে না পেরে এই ট্রেনেই উঠে পড়েছিলেন সুবুদ্ধি। খুরদা রোডে পড়ি-কী-মরি করে ট্রেন থেকে নামেন তিনি। আকুল হয়ে তাঁর স্নুপি-র খোঁজ শুরু করেন। স্টেশনে রেলকর্তারাই তখন জানান, তাঁর কুকুর পুরী চলে গিয়েছে। সুবুদ্ধি কী করেন? খুরদা রোড থেকে তখন পুরীর উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে আমদাবাদ-পুরী এক্সপ্রেস। সুবুদ্ধি অমনি বুদ্ধি করে তাতে চেপে বসলেন।

এর আগে ট্রেনে কুকুর নিয়ে রেলকর্তাদের অনেক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। যেমন দিল্লিমুখী পূর্বা এক্সপ্রেসে দু’টি ডোবারম্যানকে সামলাতে গিয়ে বেচারি গার্ডের প্রায় আত্মারাম খাঁচাছাড়া দশা হয়েছিল এক বার। ট্রেন ছাড়তেই দু’জন ডগবক্স ভেঙে বেরিয়ে এসেছিল। মানিকজোড়ের দাঁতখিচুনি দেখে কয়েক মিনিটেই গার্ড সংজ্ঞা হারান। পরে শেওড়াফুলি স্টেশনে দুই সারমেয়কে বের করে নতুন গার্ড এনে ট্রেন চালানো হয়।

এ যাত্রা স্নুপি অবশ্য রেলকর্মীদের সে-ভাবে ভোগায়নি। ডগবক্সের আরামে গুটিসুটি মেরে লম্বা রেলসফরে দিব্যি ঘুম দিয়েছে সে। এক বছর তিন মাসের ‘কিশোর’, সঙ্কর প্রজাতির পাটকিলে চতুষ্পদটি পুরীতে নেমে জুল জুল চোখে তার মালিকের খোঁজ করছিল। সুবুদ্ধি পুরী এসে পৌঁছনোর পরে তার প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। পুরী স্টেশনের রেলকর্মীরা জানিয়েছেন, অনেকক্ষণ পরে আপনজনকে দেখে স্নুপি আবেগ সামলাতে পারেনি। আনন্দে ল্যাজ নেড়ে প্রচণ্ড লাফাচ্ছিল। পরে ফোনে ধরা হলে স্নুপির মালিকের কণ্ঠস্বরেও মিলল অপার আনন্দের ছোঁয়া, ‘‘ছাড়াছাড়ি হওয়ার পরে রাতভর টেনশনে ছিলাম। পুরীতে ওকে দেখে ধড়ে প্রাণ এল।